বিজয় দিবস ও মুজিববর্ষ উদযাপনে
ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী রাম নাথ কোবিন্দের বক্তব্য
Statements & Speeches

বিজয় দিবস ও মুজিববর্ষ উদযাপনে ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী রাম নাথ কোবিন্দের বক্তব্য

বিজয় দিবস ও মুজিববর্ষ উদযাপনে
ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী রাম নাথ কোবিন্দের বক্তব্য
১৬ ডিসেম্বর ২০২১, সংসদ ভবন, ঢাকা

• বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদজি
• মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাজি
• মাননীয় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীজি
• মাননীয়া শেখ রেহানাজি
• ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, আন্তর্জাতিক বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী
• আ ক ম মোজাম্মেল হক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী
• বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রীগণ
• ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ

নমস্কার!
শুভ সন্ধ্যা!
আসসালাম ওয়ালাইকুম!

আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই ঐতিহাসিক ৫০তম বার্ষিকীতে, আমি আপনাদের ১৩০ কোটি ভারতীয় ভাই-বোনদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের সাথে এই ঐতিহাসিক দিনটি উদযাপন করছি: পঞ্চাশ বছর আগে, দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শিক মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছিল এবং গর্বিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এই উপলক্ষে আমি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের, বিশেষ করে নির্যাতিতা মা-বোন-কন্যাদের অবর্ণনীয় দু:সহ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের আত্মত্যাগ এবং বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবিই এই অঞ্চলকে বদলে দিয়েছে।
ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ
২. প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো এত মহাকাব্যিক ত্যাগের সাক্ষী মানব সভ্যতা খুব কমই হয়েছে। আপনাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রতিটি ভারতীয়, বিশেষ করে আমার প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। গতকাল সাভারে লাখো শহীদের স্মৃতিসৌধ এবং বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন ছিল আমার জন্য গভীর আবেগময় অভিজ্ঞতা। আমি তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের সারাংশ শুনে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এটি সর্বদা ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের চেতনাকে উদ্দীপিত করে তাই ইউনেস্কো এই ভাষণকে বিশ্বতালিকায় ন্যায়সঙ্গতভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
৩. আপনাদের সংগ্রাম ভারতে যে মাত্রায় সহানুভূতি এবং তৃণমূল-স্তরের সমর্থন লাভ করেছে তার পরিমাণও ইতিহাসে বিরল। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের জনগণকে সম্ভাব্য সকল সহায়তা প্রদানের জন্য তাদের হৃদয়-দ্বার উন্মুক্ত করেছে। আমাদের ভাই-বোনদের তাদের প্রয়োজনের সময়ে সাহায্য করা আমাদের জন্য সম্মানের এবং পবিত্র দায়িত্ব ছিল।
ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ

৪. ইতিহাস সর্বকালে আমাদের বন্ধুত্বের এই অনন্য ভিত্তির সাক্ষ্য দেবে যে গণযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। সেই যুদ্ধের কয়েকজন সাক্ষী (ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই) এখানে দর্শকদের মধ্যে রয়েছেন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন এবং তারা আমাদের বিশ্বাস এবং বন্ধুত্বের শক্তির জীবন্ত সাক্ষ্য, যা পাহাড়কেও টলাতে পারে।
মহামান্যগণ, সোনার বাংলার বন্ধুরা,
৫. মুক্তিযুদ্ধের ৫০বছর পূর্তি উদযাপনে আমার সফর ও অংশগ্রহণের জন্য আপনাদের আমন্ত্রণ একটি অনন্য সম্মান। এটি আমাদের বিশেষ বন্ধুত্বের একটি সত্যিকারের প্রতিফলনও বটে। আমি আনন্দিত যে, প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর মতোই, কোভিড মহামারী শুরু হওয়ার পর ভারতের বাইরে আমার প্রথম সফর আপনাদের দেশ বাংলাদেশে। মুজিববর্ষ উদযাপনে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমিও সম্মানিত।
মাননীয়গণ,
৬. পঞ্চাশ বছরের কিছু আগে, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু তখন সমালোচক, সন্দেহবাদী এবং নিন্দাকারীদের কাছে এটি একটি দূরবর্তী এবং অসম্ভব স্বপ্ন বলে মনে হয়েছিল। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেন মুক্তির সম্ভাবনাকে বাতিল বলে মনে হচ্ছিল। একটি নিষ্ঠুর, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সুসজ্জিত শত্রু, যারা কোনো কিছুতেই থামবে না, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাংলাদেশের প্রতিকূলতা ছিল অনেক বেশি।
৭. কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নৈতিক দৃঢ় প্রত্যয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি ন্যায়বিচারের জন্য তার অদম্য দৃঢ়তা ছিল সত্যিকার অর্থে পট পরিবর্তনকারী। ফলস্বরূপ, বিশ্ব একটি মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছাকে কোনো শক্তি দ্বারা দমন করা যায় না, তা যতই নৃশংস হোক না কেন।
ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ

৮. আমার মনে আছে যে, একজন যুবক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নৈতিক সাহসে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। অন্যান্য লাখো মানুষের মতো আমিও তার বজ্রকণ্ঠে এবং সেই সময়ে বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের আকাঙ্খা বহনকারী উপলব্ধিতে বিদ্যুতায়িত হয়েছিলাম। আমার প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের মতো, আমরা একটি অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ে উল্লসিত হয়েছিলাম এবং বাংলাদেশের জনগণের বিশ্বাস ও সাহসে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।
৯. বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন একটি বাংলাদেশ যা শুধু রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়, বরং একটি ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রও বটে। দুঃখের বিষয়, জীবদ্দশায় তাঁর দর্শন বাস্তবায়িত হতে পারেনি। স্বাধীনতা-বিরোধীরা যারা বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তারা বুঝতে পারেনি যে বুলেট এবং সহিংসতা এমন একটি ধারণাকে নির্বাপিত করতে পারে না যা মানুষের কল্পনাকে ধারণ করেছে। সর্বোপরি, তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় সংকল্প এবং সহনশীলতার উপর নির্ভর করেনি, যিনি অসাধারণ সাহসিকতার সাথে গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা এবং স্বৈরশাসন মোকাবিলা করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় এবং তাঁর বিদ্রোহী চেতনার দ্বারা চালিত হয়েছেন, যেমনটি মহান কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতায় বর্ণিত হয়েছে:
আমি উদ্ধৃত করছি-
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত

বন্ধুরা,

১০. আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও উদ্যোগী জনগণ বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শগুলো বাস্তবায়ন করছে।

১১. আমরা গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছি, যা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগও তৈরি করেছে। ভৌগোলিক সুবিধা ও আপনাদের দেশের চমৎকার অর্থনৈতিক সাফল্য সমগ্র উপ-অঞ্চল এবং বিশ্বকে উপকৃত করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান ধারণা রয়েছে যে, ঘনিষ্ঠ উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সংযোগ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সোনার বাংলা গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করবে।

১২. বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বকে ভারত সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমরা আমাদের বন্ধুত্বের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে সহায়তা করার জন্য আমাদের যথাসাধ্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে, আমরা ধারাবাহিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, ছাত্র বিনিময় এবং সহযোগিতার একাধিক ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মকাণ্ড দেখেছি। এগুলো সবই আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা এবং আমাদের নিজ নিজ দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের উপর ভিত্তি করে একটি টেকসই, গভীর বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা। আমি আনন্দিত যে, আমাদের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলি এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।

মহামান্যগণ,

১৩. বাংলাদেশ একটি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উর্বর জমি এবং নদীবিধৌত অনন্য দেশ। এটি কবি, শিল্পী, পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের দেশ। ঐতিহাসিকভাবে এই ভূখণ্ডের মানুষ সবসময় শিল্প এবং পাণ্ডিত্যকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছে। আপনারা সর্বদা আপনাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রভাবশালী এবং ঐক্যবদ্ধ উপাদান- মন, সংস্কৃতি এবং ভাষার সাধনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলস্বরূপ, আপনাদের ইতোমধ্যেই একটি সুসংগত, সম্প্রীতিপূর্ণ এবং গতিশীল সমাজের অনন্য মেলবন্ধন রয়েছে।

মহামান্যগণ, সম্মানিত অতিথিবর্গ, ভদ্রমহিলা এবং মহোদয়গণ,
১৪. যদি আমাদের অংশীদারিত্বের প্রথম ৫০ বছর অসাধারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শুরু হয়, যা আমাদের জনগণের মধ্যে একটি গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করে, তাহলে সম্ভবত এই সীমাকে আরও বৃদ্ধি করার সময় এসেছে।
১৫. এটি অর্জনের জন্য আমাদের ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ এবং বিশেষ করে আমাদের যুবকদের ধারণা, সৃজনশীলতা, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির জগতে যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী অগ্রগামী উদ্যোগ তৈরিতে অনুপ্রাণিত করতে হবে।
১৬. আমাদের উদ্ভাবকদের আমাদের সাধারণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে নতুন সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আহ্বান জানানো উচিত।
১৭. আমাদের আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক সেরা ধারনাগুলি খুঁজে বের করার জন্য চিন্তাবিদদেরকে আমাদের নিজস্ব অনন্য সাফল্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য অনুরোধ করতে হবে। আন্তঃসংযোগের একটি নতুন যুগে প্রবেশ করার সাথে সাথে আমরা ধারণা এবং উদ্ভাবনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের সুযোগ তৈরি করতে পারি।
ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ

১৮. উৎপাদন এবং পরিবহণ সংযোগের গভীরভাবে সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে করতে আমাদের ব্যবসাগুলিকে উৎসাহিত করা উচিত, যা আমাদের উপ-অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র এবং পণ্য ও পরিষেবাগুলির জন্য বিশ্বের বৃহত্তম বাজার হতে সক্ষম করবে৷
বন্ধুরা,
১৯. আমাদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর হওয়ার সাথে সাথে, আসুন আমরা আমাদের জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একসাথে কাজ চালিয়ে যাই।

জয় হিন্দ, জয় বাংলা, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চিরজীবী হোক!

ধন্যবাদ!