Victory Day Celebration-2019 চলমান ঘটনাবলী

বিজয় দিবস উদযাপন-২০১৯

ভারতীয় হাই কমিশন, ঢাকা

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

          জনাব শাজাহান খান, সাংসদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজেন্দ্র সিং কাদিয়ান, পিভিএসএম, এভিএসএম, ভিএসএম (অবসরপ্রাপ্ত)। 

          একাত্তরের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা আবারও ঢাকা ও কলকাতায় একত্রিত হয়ে বিজয় এবং তাদের চিরন্তন বন্ধন উদযাপন করবে। বিজয় দিবসে বাংলাদেশ ও ভারতের মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিনিময়মূলক সফর ২০০৫ সালে শুরু হয়েছিল এবং বাংলাদেশ থেকে ৪০০ জনের বেশি মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৭৫ জন ভারতীয় প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা কলকাতা ও ঢাকায় বিজয় দিবস উদযাপনে অংশ নিয়েছেন।

          এই বছর ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছয়জন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গীদের সাথে নিয়ে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ১৪-১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত কলকাতায় বিজয় দিবস উদযাপনে অংশ নেবেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন সাংসদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব শাজাহান খান। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মধ্যে বেড়া পৌরসভার মেয়র, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি, এসপি, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, অন্যান্য ঊর্ধ্বতন অবসরপ্রাপ্ত আমলা, বিশিষ্ট বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান কর্মকর্তাগণ। প্রতিনিধিদলটি তাদের সম্মানে আয়োজিত বিভিন্ন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবে এবং ভারতীয় প্রবীণ মুকিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে। তারা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক নিবাস জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করবেন।

          একইভাবে, ২৭ জন ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং চারজন সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গীদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ঢাকা পৌঁছাবে বিজয় দিবস উদযাপনে অংশ নিতে। সফরকালে তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনী প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশের ওয়ার কোর্স ফাউন্ডেশন এবং ভারতীয় হাই কমিশন আয়োজিত পৃথক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেও সাক্ষাৎ করবেন। প্রতিনিধি দলটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবে এবং মুক্তিযুদ্ধের কিছু যুদ্ধক্ষেত্রও পরিদর্শন করবে।

          লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজেন্দ্র সিং কাদিয়ান, পিভিএসএম, এভিএসএম, ভিএসএম (অবসরপ্রাপ্ত) হলেন ভারতীয় প্রতিনিধি দলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তার কোম্পানিকে ১৯৭১ সালের নভেম্বরে শত্রুপক্ষের অতর্কিত বিমান হামলা থেকে অব্যবহৃত রানওয়ে রক্ষার জন্য আগরতলা বিমানবন্দর সংলগ্ন চাঁদপুর গ্রামের ঘন অরণ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ০৩ ডিসেম্বর এই ব্যাটালিয়নকে সীমানা অতিক্রম করে চাঁদপুরের শত্রুঘাঁটিতে আক্রমণের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে আক্রমণ শুরু হয়েছিল। এই অপারেশন চলাকালীন, ব্যাটালিয়নকে বানানো নৌকা ব্যবহার করে প্রমত্তা মেঘনা নদী পার হতে হয়েছিল। উদ্দেশ্য সফল হওয়ার পর তারা আগরতলা-আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ঢাকা অভিমুখে এগিয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পুবাইলেও এই ব্যাটালিয়ন যুদ্ধ করে। প্রতিকূল এলাকা এবং শত্রুদের সাথে লড়াই করে তারা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শত্রুবাহিনী আত্মসমর্পণ করার কিছু পরেই ঢাকা পৌঁছেছিল।

          লেফটেন্যান্ট জেনারেল সরব জোত সিং সায়গল, পিভিএসএম, ভিএম, ভিএসএম (অবসরপ্রাপ্ত), ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় বাগডোগরায় একটি এয়ার অপারেশন ফ্লাইটে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন যশোর সেক্টরে মোতায়েন করা একটি পদাতিক বাহিনীর সহায়তাকারী একজন ডিটাচমেন্ট কমান্ডার। তিনি যুদ্ধের সময় আর্টিলারি ফায়ার পরিচালনায় মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন। দর্শনার যুদ্ধে, তিনি আকাশ থেকেই পুরো বিভাগীয় আর্টিলারি ফায়ার প্ল্যানটি বেতারে নিবন্ধিত করেছিলেন কারণ মাটি থেকে দৃ্শ্যমানতা সীমাবদ্ধ ছিল। একটি বিশেষ হামলা চলাকালীন, পাকিস্তানি বিমানবাহিনী তার হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করতে এফ৮৬ নিক্ষেপ করে যা উনি এড়িয়ে যান। পরে অবতরণ করার সময় লক্ষ্য করেছিলেন যে তার হেলিকপ্টারটি আগুনে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তিনি খুলনা সেক্টরেও যুদ্ধ করেন এবং বেশ কয়েকটি রেকি মিশনও সম্পন্ন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন ও পূর্ববর্তী সময়ে তিনি মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ৩০০ ঘণ্টারও বেশি সময় অপারেশন পরিচালনা করেছেন।

          লেফটেন্যান্ট জেনারেল রবি রায়চাঁদ, এভিএসএম (অবসরপ্রাপ্ত) ২৩৫ ইঞ্জিনিয়ার রেজিমেন্টে একজন অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এই রেজিমেন্টের উপর হিলি দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। নদীবেষ্টিত ভূখণ্ড হওয়ার কারণে এখানে অগ্রসর হওয়া খুব কঠিন ছিল। এই আক্রমণটির মূল লক্ষ্য ছিল উত্তরাঞ্চলের শত্রুবাহিনীকে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বগুড়ার যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। ২২ / ২৩ নভেম্বর ১৯৭১ রাতে, টি - ৫৫ ট্যাঙ্ক নিয়ে ৮ জন গার্ড এবং তার ইঞ্জিনিয়ার ফিল্ড কোম্পানি শত্রু বাহিনীর হাতে থাকা হিলি আক্রমণ করে এবং দখল নেয়। ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পরে রেজিমেন্টকে দিনাজপুর ও ঢাকার মধ্যে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যা পশ্চাদপসরণকারী শত্রুবাহিনী ভেঙে ফেলেছিল। এই কার্যক্রমের মধ্যে ছিল রাস্তা পরিষ্কার করা, মাইন এবং ফাঁদ অপসারণ, সেতু নির্মাণ এবং ফেরি চলাচল পরিচালনা করা। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে এই সেক্টর থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সর্বশেষ ইউনিটগুলির মধ্যে তার রেজিমেন্ট ছিল অন্যতম।

          একাত্তরের যুদ্ধের সময় লেফটেন্যান্ট জেনারেল অবদেশ প্রকাশ, পিভিএসএম, এভিএসএম, ভিএসএম (অবসর), তাঁর ব্যাটালিয়নের অংশ হিসাবে সক্রিয় অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ব্যাটালিয়নকে মধুমতি নদীর উপরে একটি ফেরি সাইট দখল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল আখাউড়া-ঝিনাইদহ-মোগুরি অঞ্চলে। তিনি কুষ্টিয়া ও হার্ডিং ব্রিজ এলাকায় অভিযানের অংশ ছিলেন। তিনি বরিশালে মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণে সহায়তা করেছিলেন এবং মুক্তিবাহিনীর জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক শিবির স্থাপন করেছিলেন যেখানে প্রায় এক হাজার সশস্ত্র কর্মীকে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন, তিনি খুলনা থেকে রুরকি যুদ্ধবন্দী শিবিরে কয়েদিদের বহনকারী বিশেষ ট্রেনের অফিসার ইন চার্জ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

          ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল রাম চন্দর তিওয়ারি, এসএম। তিনি ১৯৮৭ সালের ১৩ই জুন পদাতিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। তিনি উত্তর ও পূর্ব সেক্টরে একাধিক ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সেনা সদর দপ্তরে বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জুন ২০০৫ থেকে জানুয়ারি ২০০৮ পর্যন্ত একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এবং এপ্রিল ২০১৩ থেকে আগস্ট ২০১৪ পর্যন্ত একটি পদাতিক ব্রিগেডের অধিনায়ক ছিলেন। বাধ্যতামূলক কোর্স ছাড়াও এই কর্মকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'পদাতিক অফিসার' অ্যাডভান্সড কোর্স এবং সুইজারল্যান্ডে ‘শান্তির অংশীদার’ কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। তিনি এপ্রিল ২০০২ থেকে এপ্রিল ২০০৩ অপারেশন্সের স্টাফ অফিসার এবং ফেব্রুয়ারী ২০১১ থেকে ফেব্রুয়ারী ২০১২ পর্যন্ত বাহিনী সদরদপ্তরের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসেবে কঙ্গোয় জাতিসংঘ মিশন (এমওএনইউসি) দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ফেব্রুয়ারি ২০১৯ থেকে ইস্টার্ন সেক্টরে একটি ডিভিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত।

          এই অনুষ্ঠানগুলি কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা বাংলাদেশী ও ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে। তাদের অভিজ্ঞতার রোমন্থন করে তারা জীবনে গৌরব, ত্যাগ এবং যে চেতনা নিয়ে দু'দেশের মানুষেরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা সামনে নিয়ে আসে। তাদের ভ্রাতৃত্ব, সাহসিকতা এবং ত্যাগের উত্তরাধিকার সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং সামনেও তা দুই দেশের সশস্ত্রবাহিনী এবং জনগণকে একসূত্রে আবদ্ধ করে চলবে।

ঢাকা
১৪ ডিসেম্বর ২০১৯